রক্তশূন্যতা কেন হয় এবং প্রতিরোধে করণীয়

রক্তশূন্য সমস্যাটা শুধু আমাদের দেশে নয় সারা বিশ্বব্যাপী জুড়ে রয়েছে এ সমস্যা। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে যে সারা পৃথিবী জুড়ে মোট জনসংখ্যা ৩০ ভাগ মানুষ বিভিন্নভাবে রক্ত স্বল্পতায় ভুগতেছেন। আমাদের দেশেও এর পরিমাণ ক্রমশ বেড়েই চলছে।

তবে লক্ষ্য করা গেছে যে পুরুষের তুলনায় নারীদের এ সমস্যাটা পরিমাণে খুব বেশি। প্রকৃতপক্ষে এটি কোন প্রকার রোগ নয় বরং এটি কোন অসুখ বা রোগের পূর্ব লক্ষণ। অনেকেই ভাবেন যে রক্তশূন্যতা বলতে শরীরে রক্তের পরিমাণ কমে যাওয়াকে বুঝে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা একেবারে ভুল ধারণা। রক্তস্বল্পতা বলতে রক্তে লোহিত কণিকায় হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ অত্যন্ত কমে যাওয়াকে বুঝায়। বিশেষ করে গর্ভবতী মহিলাদের মৃত্যুর হার রক্তশূন্যতা দায়ী। এ সমস্যা বিভিন্ন কারণে হতে পারে।

রক্তস্বল্পতা দেখা দেওয়ার বিভিন্ন কারণগুলো হচ্ছে-

১. থ্যালাসেমিয়া
২. ব্লাড ক্যান্সার
৩. দেহে আয়রনের অভাব
৪. অ্যানিমিয়া
৫. এপ্লাস্টিক এনিমিয়া
বিজ্ঞানসম্মত সংজ্ঞা দিতে গেলে, বয়স ও শারীরিক কাঠামো অনুযায়ী রক্তের মধ্যে প্রয়োজনীয় হিমোগ্লোবিনের চেয়ে কম মাত্রায় থাকলে রক্তশূন্যতা বা এনিমিয়া বলে থাকে।

রক্তশূন্যতা হলে যেসব লক্ষণ দেখা যায়

যদি স্বল্পমাত্রায় রক্তশূন্যতা দেখা যায় তাহলে তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। কিন্তু এর পরিমাণ বেশি হলে বেশ কিছু লক্ষণ দেখা যায় আর সেগুলো হচ্ছে-

১. চোখ ঝাপসা লেগে যায়। বেশ কিছুক্ষণ একনাগাড়ে কোন কাজ করতে থাকলে চোখে ঝাপসা লাগা শুরু করে। মনে হয় সামনের জিনিস ধীরে ধীরে ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে।

২. স্বল্প পরিশ্রমে শ্বাসকষ্ট হয়ে যায়। অর্থাৎ কোন প্রকার একটু দীর্ঘ সময় করলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। এমনকি হাঁটা চলা দ্রুত করলে শ্বাস গ্রহণের পরিমাণ বেড়ে যায়। এছাড়া যে কোনো কাজেই এমন হতে পারে।

৩. খুব দ্রুত দুর্বলতা এবং ক্লান্তি অনুভব হতে থাকে। যে কোনো সময় নিজেকে দুর্বল অথবা ক্লান্ত অনুভব হতে পারে। কোন কাজ করা হোক বা এমনি বসে থাকা হোক না কেন যে কোন ক্ষেত্রেই হতে পারে।

৪. বুক ধড়ফড় অনুভব। কোন কঠিন বা শক্ত কথা শুনলে বুক ধড়ফড় অনুভব হবে। এছাড়া কোন কাজের ক্ষেত্রে এরকম হতে পারে।

৫. কিছুক্ষণ পর পর মাথা ঝিমঝিম অনুভব হতে থাকবে। মনে হবে মাথার ভেতরের অংশ হালকাভাবে কাঁপুনি দিচ্ছে। অথবা জমাট বেঁধে রয়েছে। মাঝেমধ্যেই এরকম হয়ে থাকে।

৬. শরীরের বিভিন্ন অংশ ফ্যাকাসে হয়ে যেতে থাকে। অর্থাৎ কোন কোন অংশ একেবারে সাদা হয়ে যায়। যা সহজেই সবার নজরে আসে।

৭. হাত পা সহ সারা শরীর ঝিন ঝিণ অনুভব হয়। এমনকি শরীরের যেকোনো সময় অবশ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অনেকে আছে মাঝে মধ্যে অনেকের কিছু অংশ অবশ হয়ে যায় আবার তখনই ঠিক হয়ে যায়।

৮. খাবারের প্রতি অস্বাভাবিক আগ্রহ বেড়ে যায়। বারবার সে কোন খাবারে খেতে ইচ্ছে হবে। এ ক্ষেত্রে দেখা যায় অধিকাংশ মানুষ প্রচুর পরিমানে খেতে শুরু করে। বাকিদের খাবারের প্রতি আগ্রহ হলেও খেতে পারেন না।

৯. মুখের কোনা সহ জিহবাতে গা হয়ে থাকে। এত করে খাবারের সময় একটু ঝাল হলে বেশ অস্বস্তি বোধ হয় এবং জ্বালাপোড়া শুরু করে।

১০. খাবার গিলতে অসুবিধা হয়। বারবার গলা শুকিয়ে যেতে শুরু করে। বেশিরভাগ শুষ্ক জাতীয় খাবার খেতে অসুবিধা বোধ হয় এজন্য অনেকে এ খাবার এড়িয়ে যেতে শুরু করে। তাই এ সময়ে বেশি পানি পান করা উচিত।

১১. নখ গুলো আস্তে আস্তে ভেঙে যেতে শুরু করে। তাছাড়া আস্তে আস্তে চামচ আকৃতি হয়ে যায়।

রক্তশূন্যতা জনিত প্রধান রোগ সমূহ

প্রথমেই বলা হয়েছে রক্তশূন্যতা কোন রোগ নয় এটি কোন রোগের একটি পূর্ব লক্ষণ। সাধারণত এর কারণে যেসব রোগ হয়ে থাকে সেগুলো হচ্ছে-

১. উঠতি বয়সে শিশুদের খাবারের প্রতি অনীহা ভাব দেখা যায়।
২. গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে দুগ্ধ সমস্যা দেখা দিতে পারে এবং বাচ্চারা প্রয়োজনীয় আয়রন সমৃদ্ধ খাবার পাবে না।
৩. কৃমি দ্বারা সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা
৪. যেকোনো ধরনের আলসার হতে পারে
৫. পাইলস হেমোরয়েড হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
৬. পাকস্থলী বা অন্তরে ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা
৭. অন্যান্য যে কোন রোগ হতে পারে।

রক্তশূন্যতার চিকিৎসা ও প্রতিকার

রক্তশূন্যতা বিভিন্ন কারণে হয়ে থাকে। তবে এর চিকিৎসার পূর্বে অবশ্যই জেনে নিতে হবে কী কারণে রক্তশূন্যতা হয়েছে। তা না হলে ভুল চিকিৎসায় হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অপুষ্টিজনিত এবং আয়রনের অভাবে এরকম হয়ে থাকে। এজন্য প্রচুর পরিমানের শাকসবজি খেতে হবে বিশেষ করে যেগুলোতে খনিজ উপাদান বিদ্যমান রয়েছে। যেমন কচু শাক, পালং শাক, সিম, শিমের বিচি, সামুদ্রিক মাছ, কাঁচা কলা, গিলা, কলিজা, খাসি বা গরুর মাংস ইত্যাদি। এ গুলোতে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টি এবং আয়রন থাকে।

এসব খাবার নিয়মিত খেলে রক্তশূন্যতা হওয়ার সম্ভাবনা একদমই থাকে না। আর যদি হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায় তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। কোন কবিরাজ বা অসাধু ডাক্তারের কাছে যাওয়া যাবে। টাকার লোভে মানুষের ক্ষতি করতেও দ্বিধাবোধ করে না। বর্তমান সময়ে ডাক্তাররা বিভিন্ন ধরনের খাবার ট্যাবলেট এবং ক্যাপসুল আকারে ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

এসকল তথ্য গুলো আমরা নিজেরা জানার পাশাপাশি আমাদের আশেপাশে ব্যক্তিদেরকে জানানোর চেষ্টা করব। এতে করে আমরা নিজে ভালো থাকবো এবং অপরকে ভালো রাখার জন্য সহযোগিতা করব।

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে নাস।