রাজশাহীর কিছু দর্শনীয় স্থানসমূহ

রাজশাহী বিভাগ বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চলে অবস্থিত। এই অঞ্চল অত্যান্ত মনোরম পরিবেশে সজ্জিত। এখানে বর্তমানে যেমন আধুনিকার ছোয়া রয়েছে, ঠিক তেমনি প্রাচীন ঐতিহ্য রয়েছে। তাই আপনি যখন রাজশাহী যাবেন, তখন বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান গুলো দেখে আসতে পারেন। এ স্থানগুলো নিয়ে এ পোস্টে আলোচনা করা হচ্ছে:

সাফিনা পার্ক

এ পার্ক গোদাগাড়ী উপজেলার দি গ্রামে অবস্থিত। সর্বমোট ৪০ বিঘা জমির উপর নির্মাণ করা হয়। ব্যক্তিগত উদ্যোগে ২০১২ সালে নির্মাণ করা হয়। নির্মাণের পর প্রায় দুই বছর এ পার্ক বন্ধ রাখা হয়। গোদাগাড়ী উপজেলা থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ছোট থেকে বয়স্ক পর্যন্ত যেকোনো দর্শনার্থীরা এ পার্কের বিনোদন উপভোগ করতে পারেন। কেননা এখানে রয়েছে চিত্তবিনোদন এবং পিকনিক স্পট। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে এর জনপ্রিয়তা আরো বেড়ে গেছে।
এখানে রয়েছে নানা রকম ফল, ফুল এবং ঔষধি গাছ। এগুলো পার্কটিকে চারদিকে ঘিরে রয়েছে। দেখতে অত্যান্ত দৃষ্টিনন্দন এবং মনোরম। আর এখানে রয়েছে নানা ধরনের পশু পাখির কৃত্রিম উপায়ে তৈরি ভাস্কর্য। নাগরদোলা, ট্রেন, দোলনা, থ্রিডি সিনেমা এবং কিডস স্পোর্টস জোন রয়েছে ছোট বাচ্চাদের জন্য। এখানে শিশুরা তাদের মনের ইচ্ছামতো এসব রাইড গুলো উপভোগ করতে পারে। এছাড়া এখানে রয়েছে দুটি লে ক যেখানে নৌকা দিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারবেন। একমাত্র পার্ক কর্তৃপক্ষ দ্বারা অনুমতি প্রাপ্ত ব্যক্তি মাছ ধরার সুযোগ পাবেন। যে কোন অনুষ্ঠানের জন্য রয়েছে পিকনিক, স্পট, কনফারেন্স রুম এমনকি মঞ্চেরও ব্যবস্থা রয়েছে। দর্শনার্থীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে এর অভ্যন্তরে একটি কেনাকাটার জন্য শপিং তৈরি করা হয়েছে।
সাফিনা পার্ক সাধারণত সকাল ৮ টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত খোলা থাকে। তবে গরম শীতকালে এর সময় কিছুটা পরিবর্তন করা হয়। এর জনপ্রতি টিকেট মূল্য ২০ টাকা।

বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর

রাজশাহী বিভাগের দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর। শুধু তাই নয় বাংলাদেশের মধ্যে প্রথম জাদুঘর হচ্ছে রাজশাহী বরেন্দ্র জাদুঘর। প্রত্নতত্ত্ব সংগ্রহের তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ায় এর গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। শুধু একটিমাত্র দর্শনীয় স্থান নয়। আমাদের ঐতিহ্য বটে। ১৯১০ সালে দিঘাপাতিয়ার জমিদার শরৎকুমার সহ বেশ কিছু আইনজীবী এবং কলিজিয়েট স্কুলের শিক্ষকরা মিলে বরেন্দ্র জাদুঘর নির্মাণ করেন। মূলত রাম প্রসাদ চন্দ্র এর ঐতিহ্য সংগ্রহ করতেই তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে আরও নিদর্শনসমূহ যুক্ত করে ১৯১৩ সালে বরেন্দ্র জাদুঘর নিজস্ব ভবনে যাত্রা শুরু করে।
এ জাদুঘরে অস্তিত্ব নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা রকম সংকট দেখা দিয়েছিল। ১৯৪৯ সালে থেকেও ১৯৬১ সাল পর্যন্ত এ জাদুঘরটির অর্ধেকাংশ মেডিকেল স্কুল হিসেবে ব্যবহার করা হতো। পরবর্তীতে ১৯৬৪ সালে একেবারে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। তাই এর দায়িত্ব নিয়ে পুনরায় চালু শুরু করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ জাদুঘরটি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং মহাত্মা গান্ধী সহ বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তিরা বিভিন্ন সময়ে পরিদর্শন করেন।

জাদুঘরটিতে মোট ৯ হাজারেরও বেশি নিদর্শন রয়েছে। সংগ্রহশালায় আছে মহেঞ্জোদারো সভ্যতার প্রত্নতত্ত্ব, পাথরের মূর্তি, সিন্ধু সভ্যতার নিদর্শন এবং একাদশ শতকে নির্মিত বিভিন্ন ধরনের মূর্তি মোগল আমলের বিভিন্ন মুদ্রা। এছাড়া রয়েছে আরো নানা ধরনের রাজা সম্রাটের নিদর্শন।
জাদুঘরটি শনিবার থেকে বুধবার পর্যন্ত সকাল ১০ টা থেকে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত খোলা থাকে। বৃহস্পতিবার শুক্রবার সাপ্তাহিক বন্ধ থাকে এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ঘোষিত ছুটির দিনগুলোতে বন্ধ থাকে।

পুঠিয়া জমিদার বাড়ি ও রাজবাড়ি

রাজশাহী জেলার সবচেয়ে নজরকাড়া স্থাপত্য নিদর্শন হচ্ছে পুঠিয়া রাজবাড়ি। বিভাগীয় জেলা থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে রাজশাহী নাটোর মহাসড়ক থেকে এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এরাক বাড়িটি বহু কক্ষ বিশিষ্ট দ্বিতল ভবন। তবে এর প্রবেশের উত্তর দিকে একটি সিংহদরজা আছে। এইখান থেকে জমিদার বা রাজাগণ তাদের সকল প্রকার কাজ পরিচালনা করত। এটি একটি ইন্দো-ইউরোপীয় স্থাপত্য ঊনবিংশ শতাব্দীতে নির্মাণ করা হয়েছিল। বর্তমান সময়ে এটি লস্করপুর ডিগ্রী কলেজ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এ রাজবাড়ির চারদিকে ঘিরে রয়েছে নানা ধরনের পরীখা। এর বেশ কয়েকটি বড় বড় পুকুর রয়েছে। এগুলো নাম হচ্ছে শিব সাগর, বে কি চৌকি, মরা চৌকি, গোবিন্দ সরোবর, গোপাল চৌকি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় পুকুরটি হচ্ছে শ্যাম সাগর। যা বিশাল জায়গা জুড়ে নিয়ে অবস্থান করছে। এতে রয়েছে দুটি প্রাসাদ এবং জমিদার কর্তৃক নির্মিত কয়েকটি মন্দির। যা বর্তমান সময় পর্যন্ত এর অস্তিত্ব রয়েছে। সবচেয়ে বড় মন্দিরটি হচ্ছে আহিক মন্দির, যা ১৮২৩ সালে নির্মাণ করা হয়েছিল। এছাড়া বড় শিব মন্দির, চারতলা বিশিষ্ট পুঠিয়া মন্দির, পটিয়া পাচানি জমিদার বাড়ি প্রাঙ্গণে আরেকটি গোবিন্দ মন্দির রয়েছে। যদিও বর্তমান সময়ে এটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহার করা হলেও প্রতি বছর অনেক দর্শনার্থীরা ঘুরতে যান। এখান থেকে অনেক প্রাচীন রাজা – জমিদারদের জীবনযাত্রা ও কার্য পরিচালনার সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। পুঠিয়া রাজবাড়ি সপ্তাহের সাত দিন সকাল ৯ টা থেকে সন্ধ্যা ৫ টা পর্যন্ত খোলা থাকে।

ভ্রমণের সময় অবশ্যই নিজের মোবাইল ফোন টাকা-পয়সা এবং অন্যান্য কিছু নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে। অপরিচিত সকলের থেকে যতটা সম্ভব দূরে অবস্থান করতে হবে ।

তবে আমরা যে জায়গায় ঘুরতে ভ্রমণ করতে যাই না কেন সেগুলো আমাদের সম্পদ, ঐতিহ্য। তাই এগুলো যেন আমাদের দ্বারা কোন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আর যতটা সম্ভব এর বিস্তার চারদিকে ছড়িয়ে দেওয়ার এবং সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে নাস।